অফ্ রুট (৪)
১০ - ১১ নভেম্বর ২০১৮
'হাট্টা'তে এসে গাড়ির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি। বিক্রম আর পুষ্পা চলে গেছে অনেক আগেই। তবে শেয়ার গাড়ির দেখা নেই। আকাশ পরিষ্কার । চরম রোদ। সূর্য মাথার সাথে ০° । তাই মাফলার রূপ নিল পাগড়ির, চোখে চড়িয়ে নিলাম সানগ্লাস। আমার পাশে ব্যাগ, দোতারা আর লাঠি।
কিছু মানুষ আমার দিকে কেমন ভাবে তাকাচ্ছিল আর চলে যাচ্ছিল। বোধহয় উগ্ৰপন্থী ভাবছে। আমার বেশভুষা দেখে। আমি ও 'ডোনট্ কেয়ার' ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
কিন্তু গাড়ি আর আসে না। 'হাট্টা' পুরো চুপচাপ। দূর থেকে হালকা গান ভেসে আসছে। কোথাও কোনো অনুষ্ঠান চলছে বোঝা যাচ্ছে।
আর দাঁড়াতে না পেরে বসে পরলাম রাস্তার পাশে একটা উঁচু জায়গায়। দোতারা টা তুলে নিলাম। সময়তো কাটাতে হবে.......। বাজালাম সেই সুর যা 'ফোকটে' তে শুনেছিলাম 'নিরা জাইলে রিসাওনি..........'। গ্ৰামের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ছে সুর। একে একে পুরো গ্ৰাম থেকে বেরিয়ে এলো লোকজন। ছোট থেকে বুড়ো। আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে গেল সবাই।
বাজানো শেষ।
আমি হতবাক।
সবার বিভিন্ন প্রশ্ন আমার কাছে। কোথা থেকে এলাম, কোথায় যাব, এটা কি যন্ত্র.......! আরও অনেক। আমি ক্রমানুসারে সবাইকে উত্তর দিচ্ছি। সেখানেই ছিল 'রুপিন ভাই'( মিস্টার বুবু)। এই অঞ্চল , এমনকি 'বাঁশবোটে' এলাকাতেও তাকে নাকি এক ডাকে চেনে। মিস্টার বুবু। খুব প্রতিপত্তি লোকটির, কিন্তু দেখে বা কথা বলে একটুও বোঝা যায় না। এইসব আমি শুনলাম ওই গ্ৰামের আরও দুই বাসিন্দা , সুজিত ভাই আর কিশোর ভাই এর কাছে।
রুপিন ভাই আমার পুরো গল্পটা মন দিয়ে শুনল। বললো যে, 'আজ তো এখান থেকে কোনো গাড়ি পাবে না'। আমি ও মনে মনে হিসেব করে নিলাম যে, গাড়ি না পেলে আজ এখানেই ঘাঁটি গেড়ে , কাল সোজা শিলিগুড়ি। সবাই বলছিল আজ এখানেই থেকে যাও। জানতে পারলাম যেখানে আছি সেটা 'বড়ো হাট্টা'। সেখান থেকে ২কিলোমিটার দূরে 'ছোট হাট্টা' । আজ সেখানে ফাইনাল ফুটবল ম্যাচ। বুঝলাম গান টা ওখান থেকেই ভেসে আসছিল। সবাই খুব জোর করলো থাকার জন্য। রুপিন ভাই বললো 'তুমি আমার বাড়িতে থাকো, ফুটবল ম্যাচ দেখ, কাল আমি গাড়ির ব্যবস্থা করে দেব'। আমি ও রাজি হয়ে গেলাম।
তখন দুপুর ১:৩০ হয়ে গেছে। ২টোর সময় ম্যাচ শুরু। রুপিন ভাই এর বাড়িতে ব্যাগ দোতারা রেখে 'ছোট হাট্টা' চললাম। বড়ো হাট্টার প্রায় সব মানুষ চলেছে ম্যাচ দেখতে। উঁচু নিচু রাস্তায় পিঁপড়ের মতো সাড়ি বেঁধে। আমি ও চললাম তাদের সঙ্গে। রুপিন ভাই আমাকে গাড়িতে তুলে নিল। বললো 'তুমি আমার অতিথি, হেঁটে যেতে দেবো না'।
পৌঁছে গেলাম 'ছোট হাট্টা'। একটু পর ম্যাচ শুরু হবে। আসেপাশের গ্ৰাম গুলো থেকে লোকেরা এসেছে । প্রচুর ভিড় মাঠের চারদিকে। অনেক খাবারের দোকান বসেছে। রুপিন ভাই হয়তো বুঝতে পেরে গেছিল যে, আমার খিদে পেয়েছে। নিয়ে গেল তার ছোট হাট্টার বাড়িতে। তার পুরো পরিবারের সাথে পরিচয় করালো আমার। সেখানে আমার জাত জানতে চাইল তার বাড়ির সবাই। আমি ও উত্তরে বললাম, 'মানুষ'। এক থালা ইয়াকের মাংসের তৈরি মোমো হাজির। সাথে ছ্যাঙ। খেয়ে আবার মাঠে এলাম। বাচ্চারা তাদের ট্র্যাডিশনাল পোশাক পড়ে নাচ করছে। ততক্ষণে সুজিত ভাই ও কিশোর ভাই চলে এসেছে । তারা বলল চলো, ম্যাচ শুরু হতে দেরি আছে। গ্ৰামটা ঘুরে দেখাই তোমাকে। আমি তো এক পায়ে রাজি।
তারা আমাকে চাষবাসের গল্প বলতে লাগলো। এলাচের খেত দেখালো, স্কুয়াসের চাষ । তারপর নিয়ে গেল 'ডোংরি' তে। একটা খুব উঁচু পাথুরে জায়গা। সেখান থেকে 'বাঁশবোটে' ,'লোধমা' আর সিকিমের কিছুটা অসম্ভব ভিউ দেখা যায়।
বেশ কিছুক্ষণ বসলাম সেখানে। খেলা শুরুর অ্যানাউন্সমেন্ট শুনে ছুটে গেলাম মাঠে। মিস্টার বুবুর দল খেলবে আজ। বড়ো হাট্টার দল। খেলা শুরু। সারা মাঠ জুড়ে উত্তেজনা চরমে। মিস্টার বুবু তার দলের গোলপোস্ট এর কাছে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে। খেলা চলছে। ১-১ গোল।
হাফ টাইম। হঠাৎ বিক্রম এর ফোন।
তুমি কোথায়?
ছোট হাট্টাতে।
তুই কোথায়?
একই উত্তর।
আমি মাঠে জানতে পেরে বিক্রম আর পুষ্পা সেখানে চলে এলো। ওদের কাজ শেষ হয়েছে। বললো চলো আজ আমাদের ওখানেই থাকবে। বিপদ। এদিকে মিস্টার বুবু কে বলে দিয়েছি যে আজ তার বাড়িতে থাকব। অপ্রস্তুত ভাবেই কথা বললাম মিস্টার বুবুর সাথে। সে বলল 'ঠিক আছে যাও। কিন্তু আগামীতে এসে আমার বাড়িতে থাকতে ই হবে'। আমি ও কথা দিলাম।
একটি বাচ্চাকে দিয়ে তার বাড়িতে পাঠালো আমাদের, আমার জিনিসপত্র নেওয়ার জন্য। বড়ো হাট্টাতে এলাম। জিনিসপত্র নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে তিন জন। একটা ট্রাক আসছে। লিফ্ট নিলাম। কোনো রকমে চেপে চুপে বসে পরলাম। গল্প করতে করতে 'ধত্রে'। কাল ১১ই নভেম্বর সকাল ৮:৩০ শেয়ার গাড়ির সময়। তাই আর বেশি রাত করলাম না। ঘুম।
সকালে বিক্রমের বাড়িতে ব্রেকফাস্ট করে। শেয়ার গাড়ি। বিদায় ধত্রেকে। ১২টা নাগাদ শিলিগুড়িতে। পেট্রোলের দাম বেড়েছে। তাই ৩০০টাকা ভাড়া।
খিদে পেয়েছে খুব। একটা ভাতের হোটেল। মাছ-ভাত। হোটেলে যে মাসিমা রান্না করে তার সাথে গল্প করতে করতে খেয়ে নিলাম। আরও বেশ খানিকটা গল্প করে চলে এলাম শিলিগুড়ি বাস স্ট্যান্ড এ। তখন বেলা ১:৩০। আমার বাস বিকেল ৫ টায়। একটা চায়ের দোকানে আড্ডা দিলাম, চা খেলাম। ঘড়ি যেন স্লো - মোশান এ চলছে। তখনও প্রায় দুঘন্টা বাকি।
পিঠে ব্যাগ তুলে, চললাম শিলিগুড়ি ঘুড়তে। হাঁটতে হাঁটতে শিলিগুড়ি জংশন। রেল লাইনের পাশে একটা বস্তি এলাকায়। এক কাপ চা নিয়ে বসলাম একটা সিমেন্ট এর বেঞ্চ এ। সেখানে আলাপ টিঙ্কু দার সাথে। সিগারেট আর বিড়ির অদল বদলে বন্ধু হয়ে উঠলাম দুজন। তার বাবা নেই তিন দিন হল। তার পরিবারের গল্প শুনলাম আমি, সেও শুনলো আমার ঘুড়ে আসার কথা। বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত ছাড়তে এলো আমাকে । বাইরের কিছু খেতে পারবেনা টিঙ্কু দা। তাই ডাব খাওয়ালাম একটা। সে আমাকে নিয়ে গেল শিলিগুড়ি বাস স্ট্যান্ডের কাছে রাস্তার ওপারে। একজন চিকেন পাকোড়া ভাজছে ঠেলা গাড়িতে। টিঙ্কুদা সেই পাকোড়া খাওয়ালো আমায়। এরকম পাকোড়া কোথাও খাইনি আগে। এতোটাই সুন্দর।
বাসের সময় প্রায় হয়ে এসেছে। টিঙ্কুদা আমাকে এক প্যাকেট বিড়ি উপহার দিল। আমার ফোন নম্বর লিখে নিল। কলকাতায় এলে যোগাযোগ করবে কথা দিয়ে, আমাকে বাসে উঠিয়ে দিল। বাস ছাড়লো। তখন ও টিঙ্কুদা দাঁড়িয়ে। হাত নেড়ে বিদায় জানালাম তাকে। বাস চলতে থাকলো কলকাতার উদ্দেশ্যে........।
অনেক মানুষের সাথে পরিচয় হল এই 'অফ্ রুট' -এ। জানিনা তাদের মনে আমি কতটা জায়গা করতে পেরেছি। তবে তারা আমার মনে সবসময় বেঁচে থাকবে, পাথরের বুকে জীবন্ত জীবাশ্মের মত........।
বিঃ দ্রঃ - যদি কারোর মনে হয় এই 'অফ্ রুট' বেছে নেবেন। তাদের জন্য এই অফ্ রুটের একটি রুট ম্যাপ ছবিতে রইলো।




Comments
Post a Comment