অফ্ রুট (২)

৬ - ৮ নভেম্বর ২০১৮

ব্রেকফাস্ট করে বিদায় জানালাম টংলুকে। যাওয়ার আগে বোতলে জল ভরে নেওয়ার কাজটা যে করতেই হয়। শেষমেশ এগিয়ে গেলাম রাস্তায় চোখ রেখে। ঘাসে জমা শিশির আবার হয়েছে জল। আকাশে কেউ যেন গাঢ় নীল রঙ ছড়িয়ে রেখেছে।
রাজু ভাইয়ের 'হোম-স্টে' এর পিছন দিক দিয়ে একটা রাস্তা আছে। কিছুটা এগোলেই 'টুমলিং' গ্ৰাম দেখা যায়। এই রাস্তা টা নেপালের বুগিয়ালের উপর দিয়ে যায়। ঘাসে ঢাকা উঁচু নিচু জমি। মাঝে মাঝে কিছু ঝোঁপ।  এই রাস্তা দিয়ে গেলে, টুমলিং পর্যন্ত গাড়ির রাস্তা টাকে বর্জন করা যায় আর কি।  মিনিট ২০ টুমলিং এলাম । আবার সাথে পেলাম কাঞ্চনজঙ্ঘা। ডানদিকে 'স্লিপিং-বুদ্ধ' কে নিয়ে চলতে লাগলাম গাড়ির রাস্তা ধরে। বিক্রম মাঝে মধ্যেই পুরোনো কিছু হিন্দি গানের দু-চার কলি গেয়ে উঠছে।
টুমলিং চেকপোস্ট।
সুনসান।
তালাবন্ধ অফিস।
 ১০০টাকার একটা পাস করাতে হয় 'সিঙ্গালিলা' তে ঢোকার জন্য। সেটা তো আর করতে হলোনা। চেকপোস্ট পার করে , আবার গাড়ির রাস্তাকে বিদায় জানালাম।  আমার অফ্ রুট শুরু। চললাম বাঁ দিকে। জাউবাড়ির উদ্দেশ্যে। আজ আস্তানা সেখানেই। কারণ আজ ও বিক্রমকে বাড়ি যেতে দেবো আমি। আজ যে দিওয়ালি।

'জাউবাড়ি ' নেপালের ছোট্ট একটি গ্ৰাম। একটাই রাস্তা, সোজা চলে গেছে। পাথুরে রাস্তা। রাস্তার দুই ধারে বাড়ি গুলো সজ্জিত। গ্ৰামটায় ঢোকার মুখেই নেপালের চেকপোস্ট। এন্ট্রি করে নিলাম সেখানে।  সকাল ১১টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম আমার আজকের আস্তানায়। সোনাম ভাই এর বাড়ি। খুব মিষ্টি একটি মানুষ, সোনাম ভাই। 'এভারেস্ট লজ'  এর ঠিক পাশেই তার 'তেঞ্জিং হোম-স্টে'। ঘরের সামনে একটা কাঠের বেঞ্চ। ব্যাগপত্র ঘরে রেখে এক কাপ চা নিয়ে ওই বেঞ্চে।

বিক্রম চলে গেল। আমি চা শেষ করে ঘরে গেলাম। ঠান্ডা একটু কম। আমি দোতারা বার করে বাজাচ্ছি। হঠাৎ বিদ্যুৎ বেগে একটি ছোট্ট ছেলে ছুটে এলো আমার ঘরে। আমি বাজানো থামালাম।  জিজ্ঞেস করল  এটা কি, গীটার? উত্তর দিলাম। বাজাতে চাইল। না করতে পারিনি। জাউবাড়িতে প্রথম বন্ধু আমার। নাম তেঞ্জিং।

প্রচুর গল্প , খেলা এমনকি ম্যাজিক ও দেখাতে হল তাকে। একটা সময় গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ল আমার কোলে। সোনাম ভাই এলো, ওকে নিতে। আর আমাকে জিজ্ঞেস করলো যে, আমি সব কিছু খাই কি না। আমি ও ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে দিলাম।
বাইরে বেরিয়ে  দেখলাম, গ্ৰামের  প্রত্যেকটা বাড়ির সামনে মহিলারা গাঁদা ফুলের মালা গাঁথছে।

  সোনাম ভাই এর মা এবং স্ত্রী ও সেটাই করছে। আমি জিগ্গেস করতে তারা বলেন ঘর সাজানো হবে। আজ লক্ষ্মী পূজো।  অবাক হইনি কারণ, এর আগে আমি টিম্বুরে নামের একটি গ্ৰামে জানতে পেরেছিলাম এই লক্ষ্মী পূজোর কথা ২০১৬সালে।
এই সাজানো দেখতে দেখতে আমি পুরো গ্ৰাম ঘুরে নিলাম। বাড়িগুলির ধরন দেখলে বোঝা যায় বহু পুরোনো এই গ্ৰাম।  গ্ৰামের একপ্রান্তে রয়েছে বৌদ্ধ ধর্মের উপাসনার  জায়গা 'গোল মানে'।

তার কাছেই দুটো বাচ্চা ছেলে ফুটবল খেলছে। ফুটবল টি হাতে বানানো। প্লাস্টিক কুড়িয়ে সেগুলো বলের আকার দিয়েছে উল দিয়ে বেঁধে। আর দুটো সরু  বাঁশের লাঠি পুঁতে গোলপোস্ট।
আটকাতে পারলাম না মনটাকে। মেতে গেলাম খেলায়। জানতে পারলাম ওদের আগামীকাল ম্যাচ আছে 'মানেভঞ্জন' এর মাঠে। তাই ওরা প্র্যাকটিস করছে। হঠাৎ ওদের মা ডাকল ওদেরকে। ছুটে চলে গেল ওরা। 'গোলমানে' এর সামনে থেকে স্লিপিং বুদ্ধা কে আবার ফিরে পেলাম।

লাঞ্চ টাইম। ঘরে ফিরছি। ততক্ষণে গ্ৰাম সেজে উঠেছে। প্রত্যেকের দরজা- জানলায় গাঁদা ফুলের কারুকার্য।
খেয়ে নিয়ে একটু শুয়েছিলাম। কখন যে ঘুমোলাম, কে জানে। ঘুম ভাঙ্গলো , অনেক মহিলাদের একসাথে গাওয়া একটি গানের সুরে। আমার ঘরে তখন অন্ধকার ঢুকে পড়েছে। বাইরে হাওয়ার শব্দ আর ওই গানের সুর।  লাইট জ্বেলে চলে গেলাম সোজা রান্নাঘরে। অঙ্গিটির পাশে বসতে দিল আমাকে। মাথার উপর তাকিয়ে দেখলাম ছুরপির সাড়ি ঝুলছে। নোনতা চা পেলাম এক কাপ। জানলাতে প্রদীপ দেওয়া। আর দুর থেকে ভেসে আসছে সেই গানের সুর। তেঞ্জিং একটা খেলনা গাড়ি নিয়ে টেবিলের উপর চালাচ্ছে।

আমি সোনাম ভাইকে বললাম, এই গান শুনতে যাব। সে বলল কোথাও যেতে হবেনা। তারা এখানেও আসবে। এই গান গেয়ে সারা গ্ৰাম থেকে টাকা সংগ্রহ করবে। আর সেই টাকা দিয়ে তারা তাদের ভাইদের জন্য কিছু একটা করবে।  অবশেষে সেই গানের দল এলো সোনাম ভাইয়ের বাড়িতে।  উঠোনে একটি থালা রাখা হয়েছে। থালাতে একটা পিতলের ঘট, অনেক ফুল, প্রদীপ ,ধূপ আর টাকা। মহিলারা থালাটিকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, আর গাইছে সেই গান। গান শেষ করে টাকা তুলে নিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে। আবার রওনা দিল অন্য বাড়ির দিকে।
বাইরে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। হাওয়া চলছে খুব। তার মধ্যেই চলছে বাজি পোড়ানো। ছোট বাচ্চারা সব রাস্তায়। তারাবাজি হাতে। কারোর কারোর বাড়িতে টুনি-লাইটের আলো দেখা যাচ্ছে।
রাত ৮টা। সোনাম ভাই ও তার পরিবারের সাথে আড্ডা।

খাওয়া।

বিছানা।

লাইট অফ।

পরদিন সকাল। বিক্রম এলো ৮টা নাগাদ। চা আর রুটি-সব্জি খেয়ে ৯টার সময় সবাইকে বলে বেড়িয়ে পরলাম। আমি আর বিক্রম। জাউবাড়ি থেকে নিচে নামার রাস্তা। মাটির রাস্তা। ২কিলোমিটার পর গৈরিবাস  এলো। এই মাটির রাস্তা যেখানে এসে গাড়ির রাস্তাকে স্পর্শ করে। ঠিক সেখানেই ছোট্ট একটি দোকান। ভেতরে ঢুকে পরলাম দুজন। ইয়াকের শুকনো লোমশ চামড়া দিয়ে তৈরি একটা বেঞ্চ। সেখানে বসতে দিল। চা খেলাম। দুটো ছুরপির টুকরো কিনে গালে পুরে দিয়ে বেড়িয়ে পরলাম।
'গৈরিবাস' ট্রেকারস্ হাট এর সামনে থেকে একটি রাস্তা জঙ্গলের ভেতর দিকে চলে গেছে। এই রাস্তা মানুষের পায়ে হাঁটার ফলে তৈরি হয়েছে।

 সেই রাস্তায় এগিয়ে গেলাম। যত এগোচ্ছি জঙ্গল তত গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। রাস্তার দু-পাশ দিয়ে জঙ্গল যেন আমার পা জড়িয়ে ধরছে। যত গভীর জঙ্গলের দিকে যাচ্ছি আবহাওয়া এবং মাটি হয়ে উঠছে স্যাঁতস্যাতে। আমার জুতো ভেদ করে মোজা ভিজে গেছে। পিচ্ছিল রাস্তা। শ্যাওলার বহু পরত জমেছে পাথরের গায়ে। মাঝে মধ্যেই রাস্তাটাকে  কেটেছে কিছু জলের ধারা। তার উপর দিয়ে গাছের গুঁড়ির সাঁকো।

পাতা ঝরার শব্দ। ঝিঁঝিঁ পোকাদের  সিম্ফনি।
পুরো রাস্তা জুড়ে একটি নদী আমাদের পিছু ছাড়ল না। ঝরঝর করে বইছে , আর যেন বলছে আমার সাথেই চল। চললাম। কখনো বিক্রম আগে আমি তার পিছনে, আবার কখনো উল্টোটা। আরেঃ ওইটা কি? কোনটা? ওই গাছের ডালে.....। তিড়িং বিড়িং করে নেমে ঝোঁপের মধ্যে মিলিয়ে গেল। একটা বুনো কাঠবেড়ালি।
৫-৭ কিলোমিটার এই রাস্তা। অনেক জায়গাতেই বড়ো বড়ো গাছ ভেঙ্গে পরে আছে। ওখানকার বাসিন্দারা ওই গাছের উপর খোদাই করে সিঁড়ি বানিয়ে নিয়েছে নিজেদের মতো করে। আমারাও ব্যবহার করলাম সেই সিঁড়ি ।

নিঃশ্চুপ জঙ্গল। নদীর আওয়াজ কখনো কাছে কখনো দূরে। হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট ভিজে। চোরকাঁটা, জামা-কাপড়ের প্রেমে পড়েছে। তাই নিয়েই চলছি।
জঙ্গল প্রায় শেষ। বোঝা যাচ্ছে কাছেই কোনো লোকবসতি আছে। তার অনেক নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছিল।

শেষমেশ।
আজকের ডেস্টিনেশন।


গ্ৰামটির নাম 'ফোকটে'( রিথু ফরেস্ট)।
৯-১০টী পরিবারের এই গ্ৰাম। যা আমি গুগল ম্যাপে দেখেছিলাম 'সিঙ্গালিলা' জঙ্গলে একটি আইল্যান্ড এর মতো। আর এখন সেখানেই আমি আর বিক্রম। নদীটি ও সাথে।

বাকিটা পরের পর্বে।


Comments