অফ্ রুট (১)
৪-৬ নভেম্বর ২০১৮
এটা গল্প নয়, পথ চলা।
অনেকেই 'ধত্রে' থেকে 'সান্দাক্ফু' বা ' ফালুট' গিয়ে থাকবেন। আমার পথ চলা এই রুটের- ই একটি 'অফ্ রুট' বরাবর।
যাওয়ার কথা ছিল অনেকেরই, কিছু কারণে যেতে পারেনি কেউ। তাই অগত্যা একাই বেরিয়ে পরলাম 'অফ্ রুট' এর সন্ধানে।
ট্রেনের টিকিট পেলাম না, তাই বাসে চেপে পরলাম। সন্ধ্যে ৬টা । এসপ্ল্যানেড থেকে রওনা দিল বাস। দামাল হাতির মতো ছুটে চলতে থাকলো, মহানগর পেরিয়ে। জানলা ভেদ করা হিমেল হাওয়া আর বাসের ভেতরকার অন্ধকার-মাখা নীল আলো, আমাকে ঘুম পাড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তার আর উপায় কোথায়? বাস যখনই থামে, ঘুম তখনই ভাঙে। এই নিদ্রা-অনিদ্রা চলতে চলতে, কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি। সেখান থেকে গাড়িতে মিরিক, সুখিয়া হয়ে অবশেষে পৌঁছে গেলাম 'ধত্রে'। আমার অফ্ রুটের প্রথম ধাপ।
তখন সন্ধ্যে নামার মুখে। গাড়ি থেকে নামিয়ে নিলাম ব্যাগ আর আমার অফ্ রুটের সঙ্গী বাবার দেওয়া 'দোতারা'। পিছন ফিরতেই দেখি একগাল হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে বিক্রম।
ওই রাতটা বিক্রমের বাড়িতেই আশ্রয় পেয়ে গেলাম। সোজা ওদের রান্নাঘরে, চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে গল্পে মেতে গেলাম বিক্রম এর পরিবারের সাথে। বিক্রম সদ্য বিবাহিত। তাই বাড়িতে দিওয়ালির তোড়জোড় চলছে। তবু বিক্রমকে এই সব ছেড়ে কাল বেড়িয়ে পড়তেই হবে আমার সাথে। অফ্ রুটে।
বিক্রম, 'ধত্রে' থেকে 'সান্দাক্ফু' / 'ফালুট' রুটে গাইড এর পেশায় নিযুক্ত। আমাদের আলাপ ২০১৫ সালে। তখন থেকে যখনই যাই, ওকে সাথে নিয়ে নিই।
রাতের খাবার খেয়ে সোজা ঘুম।
জানলা দিয়ে আসা প্রথম আলোতে ঘুম ভাঙ্গলো। আমার আগেই সবাই জেগে গেছে। উঠেই চা পেলাম। বিক্রম রেডি। আমি ও তৈরী হয়ে গেলাম। ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পরলাম। 'শেরপা লজ' পেরিয়ে , পাইনের জঙ্গল । তার ভিতর দিয়ে রাস্তা চলতে লাগল। প্রায় দেড় ঘণ্টা চলার পর পুরো খোলা একটা মাঠ চোখে পড়ে। শুকনো ঘাষে ঢাকা। রাস্তা চলেছে তার মধ্যে দিয়ে এঁকে বেঁকে। কিছুক্ষণ থামলাম সেখানে। দুরে উঁচুতে দেখা যাচ্ছে 'টংলু'। সেখানেই যাব আজ।
৩০ মিনিট আরও চড়াই করে পৌঁছলাম । টংলুতে এই নিয়ে তিন বার এলাম। কিন্তু এবারের অভিজ্ঞতা টা আলাদা। বিক্রমকে ছাড়তে হল টংলুতে। বাড়ি চলে গেল। বিয়ের পর এটা ওর প্রথম দিওয়ালি। টংলুতে ছিলাম রাজু ভাই এর হোম-স্টে তে। সেখানে আলাপ হয়ে গেল এক বাঙালি পরিবারের সাথে। দিব্বি কেটে গেল আমার সারা দিন। লাঞ্চ করে, গেলাম ভিউ পয়েন্ট এর উপর। কনকনে হাওয়ায় দাঁড়িয়ে দেখতে পাচ্ছি নেপালের ভ্যালি গুলোতে মেঘের খেলা। আলো-আধাঁরি। হঠাৎ একদল মেঘ ছুটে এলো আমার দিকে। তখন, আমার মধ্যে মেঘ আর মেঘের মধ্যে আমি। কোনো সিনেমার স্বপ্ন দৃশ্যের মত ছিল মুহূর্তটা।
কিছু পর সন্ধ্যে এল। অন্ধকারের মায়া, ঘিরে ধরলো টংলুকে। স্পষ্ট হয়ে গেল তারারা। চাঁদ ওঠেনি। সেদিন ছিল কালি পুজো। একভাবে তাকিয়ে ছিলাম আকাশে। তারার জঙ্গল যেন নেমে আসতে চাইছে মাটিতে। ঠিক কতক্ষণ যে বসে ছিলেম যানিনা।
হঠাৎ ডাক এলো রাতের খাবার জন্য। পাশে থাকা চায়ের কাপটা প্রায় শুকিয়ে গেছে। রাত ৮টা বাজে। খাবার খেয়ে নিলাম। রুটি আর সবজি সাথে আঁচার। অঙ্গিটির পাশে বসে উত্তাপ আর খাবার একসাথে খেয়ে নিলাম। খাওয়া শেষ। বাইরে এসে টর্চ জ্বেলে দেখলাম ঘাষের গায়ে শিশির জমে বরফ। একটা সিগারেট। তারপর ঘুম।
ভোর ৫টা , চোখ খুলে গেল। সুর্যোদয় । ঝকঝকে স্লিপিং বুদ্ধ । ঠান্ডার কাঁপুনি। এক কাপ চা।
সকাল ৭টা , বিক্রম এসে হাজির। নতুন চলা শুরু হবে........।
অফ্ রুট (২) এর লিংক -
https://baaundule1.blogspot.com/2018/12/blog-post_7.html






Comments
Post a Comment