অফ্ রুট (৩)


৮ - ১০ নভেম্বর ২০১৮

জাউবাড়ি থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার ট্রেক করে পৌঁছে গেলাম গুগল ম্যাপে দেখা সেই আইল্যান্ড এর মতো এলাকায়। 'ফোকটে' (রিথু ফরেস্ট) । বিক্রম নিজেও কখনো আসেনি এই গ্ৰামে। যেন কিছুটা আবিষ্কারের মতো অনুভুতি হচ্ছিল। এই গ্ৰামে কোনো ট্রেকার নাকি আসেনা।  বিক্রম আমি দুজনে মিলেই থাকার যায়গা খুঁজছি। সারা গ্ৰাম জুড়ে উৎসবের আমেজ। এখানে ও লক্ষ্মী পূজো হয়েছে গতকাল। তার স্পষ্ট প্রমাণ পাচ্ছি বাড়ি গুলোর দরজা-জানালায়। পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে এক একটি বাড়ি। এলোমেলো সরু রাস্তা প্রত্যেকেটি বাড়িকে যুক্ত করেছে, পাহাড়ের নিজস্ব স্টাইলে। এই গ্ৰামের মূলত জীবিকা চাষ।
সারা গ্ৰাম ঘুড়ে আমরা জানতে পারলাম  যে, তেঞ্জিং নামের একজনের বাড়িতে থাকা যাবে। গিয়ে পৌঁছলাম সেই বাড়িতে।


বাইরে থেকে শুনতে পাচ্ছি কিছু একটা গান গাইছে অনেকে মিলে।  ঢুকে পরলাম সেখানে। একটি ছেলে গানের একটা করে লাইন গাইছে, আর কিছু বাচ্চার দল ( সবাই ছেলে) তারা দোহার । এটা রিহার্সাল চলছে। আমি মন দিয়ে শুনছিলাম আর দেখছি। ওদিকে বিক্রম তখন তেঞ্জিং ভাইকে নেপালী ভাষায় কিছু একটা বোঝালো।
যে ছেলেটি গান গাইছে তার নাম রাজেন ভাই। সে আমাকে পুরো টা বলে দিল যে, এই গান কেন হচ্ছে আজ। এটা দিওয়ালির পরের দিন। এই দিন এখানে ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে (প্রাপ্ত বয়স্ক) সবাই  সেখানকার মদ পান করে। ছ্যাঙ। আমি ও বাদ পরিনি।
রাজেন ভাই বললো চলো আমাদের সাথে। আমি ও বললাম চলো। 'দেওসুরে' খেলতে। যেটার জন্য রিহার্সাল হচ্ছিল। আমার ব্যাগ ওখানেই পরে রইলো। সবাই বলছে ব্যাগের চিন্তা করতে হবে না, তেঞ্জিং ভাইয়ের মা গুছিয়ে রাখবেন। বেশ, আমিও চললাম দেওসুরে খেলতে।  যেমন করে জাউবাড়িতে মহিলারা সারা গ্ৰাম ঘুড়ে টাকা সংগ্রহ করেছিল। এটা দেখছি একদমই ওইরকম। বাড়ির উঠোনে থালা, ফুল, পিতলের ঘট, প্রদীপ, ধূপ আর টাকা। আজ এটা ছেলেদের কাজ। আমিও যোগ দিয়েছি।

গ্ৰামের  প্রত্যেকটা বাড়িতে গান শেষ হওয়ার পর রাজেন ভাই আমার পরিচয় দিচ্ছে অতিথি হিসেবে। সবাই খুব তাড়াতাড়ি আপন করে নিলো আমায় , কেন জানি না।  সব বাড়ি থেকেই কিছু না কিছু খেতে দিল আমাকে। শেষমেশ রাজেন ভাই তার বাড়ি নিয়ে গেল।  অনেক ভালোবাসা পেলাম তার পরিবারের কাছে। রুটি আর ইয়াকের মাংস দিল এক বাটি সাথে ছ্যাঙ।
এই সব শেষে তখন প্রায় সন্ধ্যে। ফিরলাম তেঞ্জিং ভাইয়ের বাড়িতে। সবাই রান্নাঘরে। গ্ৰামের অনেক লোকজন এসেছে সেখানে।  দেখলাম বিক্রম ও সেখানে চায়ে চুমুক দিচ্ছে। ইতিমধ্যেই সবাই বিক্রমের দৌলতে জানতে পেরেছে আমি দোতারা বাজাতে পারি। সবাই হা করে তাকিয়ে আমার দিকে। একজন বলে উঠল "তুমি য়ো ক্যা বাজাতে হো লেকে আও"। আমি ও বাধ্য ছেলের মত নিয়ে এলাম। আমাকে সবার মধ্যে বসতে দিল।
সবাই চুপ।
বাজালাম।
হই হই রই রই।
সবাই এক বার করে দোতারা হাতে নিল। পুরো টা ঘুড়ে আবার আমার হাতে ফিরে এলো। একজন গান ধরলেন - 'নিরা জাইলে রিসাওনি'............ আমি ও বাজানো শুরু করলাম। হুল্লোড়, গান বাজনা, খাওয়া দাওয়া।
গানের সুরের সাথে ফেড-আউট হল রাত।

পরের সকাল, গ্ৰাম জুড়ে ব্যস্ততা। আজ এখানে ভাইফোঁটা, এখানকার ভাষায় 'ভাইটীকা'। আমি ও খুব ব্যস্ত। তৈরি হচ্ছি। আজ আমার এখান থেকে যাওয়ার কথা আরও নিচের দিকে। কিন্তু যাওয়া হলো না।
গত রাতে, গানের আসরে অনেকেই নিমন্ত্রণ করলেন ভাইটীকা নেওয়ার জন্য।
আমি তৈরী । তেঞ্জিং ভাইয়ের বাড়ির পাশ থেকে একটা রাস্তা নিচের দিকে নেমে গেছে.....। সেখানেই এক দিদির বাড়িতে। ভাই টীকা নিতে বসলাম। সাথে বিক্রম ও রয়েছে। একটা বরণ ডালায় প্রচুর ফুল, ধূপ আর প্রদীপ জ্বলছে। দিদির হাতে একটা বড় ঘট, তাতে রয়েছে আতর মাখানো নদীর ঠান্ডা জল। আর লম্বা ডাঁটি সমেত একগুচ্ছ গাঁদা ফুল ঘটের উপর। সেই ফুল দিয়ে জল তুলে ছিটিয়ে দিল আমার গায়ে। আতরের সুবাসে স্নিগ্ধ হোলাম গোটা আমি।  বিভিন্ন রঙে দিয়ে টীকা এঁকে  দিলো আমার কপালে।


তারপর একটি থালা এল , বোঝাই মিষ্টি, ফল, বিস্কুট আর সাথে এক গ্লাস রক্সি। এরপর বিক্রমের পালা।
ভাই টীকা নিয়ে আস্তানায় ফিরলাম। তেঞ্জিং ভাইয়ের বাবা নিয়ে যেতে চাইলো একটা ছোট্ট ঝর্নার কাছে। চললাম তার পিছু পিছু। গভীর জঙ্গলের ভেতর। সেখানে গ্ৰামের কোনো আওয়াজ আর শোনা যায় না। এই দিকটায় কেউ আসেনা সেটা বোঝা যাচ্ছে। একটা হাইড্রো-প্রজেক্ট ছিল ঝর্নার পাশে। সেটা এখন পরিত্যক্ত। কিছুক্ষণ বসলাম ঝর্নার কাছে পাথরে। পাখি দেখার আদর্শ জায়গা বলে মনে হলো। ঝরঝর শব্দ। হাওয়ায় আলতো করে পাতার উড়ে পরা। বিভিন্ন পোকা আর পাখির ডাক।
আজ রাতের রান্না তেঞ্জিং ভাই করছে। আমি ও কাজের লেগে পরলাম।  স্পেশাল মেনু ছিল ছুরপির শ্যুপ। তেঞ্জিং ভাই সান্দাকফুর 'শেরপা স্যালেট' হোটেলে রান্না করে। তার কাছেই শুনলাম এই 'ফোকটে' একটা রাস্তা গিয়ে 'কয়াকাট্টা' তে মেলে। যেটা পুরো টাই জঙ্গলের পথ। যাওয়ার ইচ্ছেও রইলো সেই পথে।
               
                 

১০ তারিখ সকাল  'ফোকটে' কে তার নিজের জায়গায় রেখে এগিয়ে গেলাম নিচের দিকে। ৩-৪ কিলোমিটার চলার পর গ্ৰাম 'ফেদিখোলা' । তার পাশ দিয়ে চললাম আরো। নদীর ধার ঘেঁষে রাস্তার চলাচল। কিছু সময় নদীর পাশে বসে আবার হাঁটা শুরু।


'মাম্মু খোলা' পাড় হয়ে  পৌঁছলাম 'বাঁশবোটির' কাছে। আজও বিক্রমকে ছাড়তে হবে। বিক্রম ওর স্ত্রী কে নিয়ে কোথাও একটা যাবে।
আমারা এখন যেখানে, সেখান থেকে আবার গাড়ির রাস্তা শুরু হয়েছে। একটা গাড়িতে লিফট নিয়ে 'হাট্টা' এলাম। পুস্পা (বিক্রমের স্ত্রী) সেখানে অনেক্ষণ আগেই এসে অপেক্ষা করছিল। গতকাল রাতেই বিক্রম তাকে জানিয়ে দিয়েছিল এই প্ল্যান টা।
আমি আজ বিক্রমের বাড়িতে থাকব। 'হাট্টা' থেকে একটু পর একটা গাড়ি আছে সেটাতে করে ধত্রে পৌঁছতে বলে ওরা দুজন চলে গেল।
দুপুর ১২টা
সুনসান 'হাট্টা'
আমি একা দাঁড়িয়ে আছি গাড়ির অপেক্ষায়.......।


Comments

  1. Vison valo hoye6e...
    Kin2 sob aka aka kheye Nile, *vaitika*-r misti gulou...
    Pic gulo darun, amr kin2 lov lg6e.... Abr gele amkeo niye jeo plzzz

    ReplyDelete

Post a Comment